সঠিক নিয়মে বনসাই তৈরির পদ্ধতি

এখন আমাদের দেশেও উন্নত মানের বনসাই তৈরি করা হচ্ছে। বিভিন্ন ধরনের বনসাই রয়েছে। ব্রুম, রুটওভার রক, ফরমাল, ইনফরমাল, রুট অ্যাক্সপোজ, ইনফরমাল আব্রাইট, টুইনট্রাংক, টৃপলট্রাংক, মাল্টি ট্রাংক, ফরেস্ট, ডেপ্টউড, ল্যান্ডস্ক্যাপ, প্লানটিং, লিটারেটি ইত্যাদি।

বনসাই তৈরির পদ্ধতি

bonsai tree plantation
bonsai tree plantation

সঠিক নিয়মে বনসাই তৈরির পদ্ধতি:
ফরমাল বনসাইয়ের ক্ষেত্রে ডালপালাগুলোর নিয়মিত শয্যাবিন্যাস দেখা যায়। যেটা ইনফরমাল বনসাইয়ের ক্ষেত্রে দেখা যায় না। ডালপালাগুলো এলোমেলো হয়। ইনফরমাল আব্রাইট জাতীয় ইনফরমাল বনসাইয়ের মতো। তবে তা হেলানো ঝুলানো অবস্থায় থাকে।

চারা তৈরি

সাধারণত বনসাইয়ের চারা নার্সারি থেকে সংগ্রহ করতে হয়। বীজ সংগ্রহ করেও চারা তৈরি করে নিতে পারেন। যেসব প্রজাতির বীজ পাওয়া যায় না, সেসব উদ্ভিদের অঙ্গজ পদ্ধতি অবলম্বন করে চারা তৈরি করতে হয়। বীজ সংগ্রহ করেও চারা তৈরি করে নিতে পারেন। অর্থাৎ কাটিং, ঝড় বিভাজন, তেউড় বিভাজন, দাবা কলম, গুটি কলম, চোখ কলম প্রভৃতি পদ্ধতিকে কাজে লাগিয়ে চারা তৈরি করে নিতে হয়। টব বাছাই ক্যাসকেটড বা উঁচু বনসাই ছাড়া সবরকম বনসাইয়ের জন্য ছোট বাটির টব উত্তম। টবের আকার হওয়া উচিত গাছের শাখা-প্রশাখাসহ তার বিস্তারের চেয়ে কিছুটা ছোট। আকৃতি দৃষ্টিনন্দন হওয়া চাই। টবের আকৃতি সবসময় বৃত্তাকার হতে হবে এমন নয়, আয়তাকার, বর্গাকার কিংবা ত্রিভুজাকারও হতে পারে।

টবে সার মাটি প্রয়োগ

প্রথমে বিভিন্ন জাতের বনসাইয়ের জন্য আলাদাভাবে মাটি তৈরি করতে হয়। মাটি তৈরির ক্ষেত্রে জৈব সারের পরিমাণ সবচেয়ে বেশি থাকে। সব ক্ষেত্রেই দোআশ বা পলি মাটি ব্যবহার করা হয়। বনসাই টবের জন্য মাটি তৈরি করা খুব সহজ। প্রধানত দোআঁশ মাটির সঙ্গে জৈবসার মিশিয়ে বনসাইয়ের মাটি তৈরি করা হয় নিম্নোক্তভাবে:

দোআঁশ মাটি

পরিমাণ মতো, কম্পোস্ট- ১/২ কেজি হাড় গুঁড়ো ৫০ গ্রাম, খড়ি মাটি গুঁড়ো ৫০ গ্রাম, ইট গুঁড়ো ১৩০ গ্রাম, কাঠের ছাই ৭৫গ্রাম।

চারা লাগানো

কাটিং গুটি কলম বা বীজের চারা বনসাইয়ে সার-মাটি ভরে যথারীতি লাগাতে হবে। টবে জল নিষ্কাশনের ছিদ্রের ওপর ইটের কুচির পরিবর্তে এক টুকরো তারের জালি রেখে তা কিছু কাঁকর দিয়ে ঢেকে দিতে হবে। তারপর যথারীতি সার-মাটি ভরে চারা লাগাতে হবে।

বনসাই তৈরির ধাপ

বনসাই তৈরির জন্য কাণ্ড, শেকড়, শাখা-প্রশাখা ও পাতার বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ করাই যথেষ্ট নয়। টবের ছোট গাছে প্রকৃতির কোলে বেড়ে ওঠা বয়োবৃদ্ধ গাছের সুঠাম ভঙ্গিমায় আনার চেষ্টা করতে হবে।

শাখা বাছাই

বনসাইকে যে মডেলের রূপ দেওয়া হবে তা স্থির করে শাখা বাছাই করা দরকার। জোড়া পাতার কক্ষ থেকে কান্ডের দু’পাশে দু’টি শাখা গজায়। বাছাই পদ্ধতি অনুসারে এর একটিকে রাখতে হবে। নিচেরটি ডানদিকে রাখলে তার ওপরেরটি বামদিকে রাখতে হবে। আসলে বনসাইয়ের কাণ্ডের রূপ সামনের দিকে কোন শাখা থাকবে না। থাকবে কেবল ডান ও বাম দিকে এবং পেছনে কাণ্ডের মাথার দিকেও শাখা থাকতে হবে।

শাখা ছাঁটাই

প্রায়শই বনসাইয়ের বয়স ৩-৪ বছর হলে তখন প্রুনিংয়ের প্রয়োজন হয়। বাছাই করা মোটা শাখাকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কাটতে হয়। এর জন্য যে অস্ত্রটি ব্যবহার করা উচিত তার নাম কনকেভ কাটিং প্লায়ারস এর কাটার ধরন পৃথক। কাটার স্থানের চারদিক থেকে ছাল বেড়ে তাড়াতাড়ি তা ঢেকে দেয়। বন সাই পরিচর্যার জন্য স্পেশাল যন্ত্রপাতি পাওয়া যায় শুধুমাত্র সেই গুলিই ব্যবহার করুন।

তার বাঁধা

কাণ্ড বা শাখাকে সুন্দর, সুঠাম ভঙ্গিমায় আনতে যেসব কৃত্রিম উপায় অবলম্বন করা হয় তার বাঁধা তাদের মধ্যে অন্যতম। সরল শাখায় তার জড়িয়ে আঁকাবাঁকা রূপ দেয়া যায়। কাণ্ডের জন্য মোটা তার ও শাখার জন্য সরু তার প্রয়োজন। সাধারণত এজন্য তামার তার ব্যবহার করা হয়। অনেকে গ্যালভানাইজিংয়ের তারও ব্যবহার করেন। মনে রাখা দরকার, তার জড়ানোর ফলে গাছ বেশ দুর্বল হয়ে পড়ে। তার খোলার পর গাছকে ছায়ায় বা হালকা ছায়ায় অন্তত সপ্তাহখানেক রাখা দরকার। প্রয়োজন বোধে দু’তিনবার তার জড়ানো যেতে পারে; কিন্তু তা অন্তত ছয় মাস অন্তর হওয়া দরকার। বনসাই তৈরির জন্য উপযুক্ত প্রজাতির গাছ যেমন বট, পাকু, হিজল, অশ্বথ, ডুমুর, ডালিম, কদম, বাগানবিলাস, বোতল ব্রাশ, নিম, জামরুল ও তেঁতুল ইত্যাদি।

ভালো বনসাইয়ের বৈশিষ্ট্য

গাছের সামনের চেয়ে পেছনের দিকে প্রচুর পাতা থাকতে হবে। এতে করে গাছের গভীরতা বোঝা যাবে।

শেকড়

প্রকৃতিতে যেমন গাছের শেকড় মাটির উপরে কিছুটা থাকে, বনসাইয়ের ক্ষেত্রেও তা থাকা দরকার। ধীরে ধীরে উপরের দিকে যত উঠবে তত চিকন হবে। মূল কান্ডটি সবচেয়ে মোটা হবে। দুই-তৃতীয়াংশ সামনে থেকে দেখা যাবে।

শাখা-প্রশাখা

গাছের উচ্চতা থেকে অর্ধেক বা দুই-তৃতীয়াংশ জুড়ে ডালপালা থাকবে। নিচ থেকে প্রথম ডালটি সবচেয়ে মোটা হবে। এভাবে উপরের দিকে ডাল ক্রমান্বয়ে চিকন হবে।

গাছের বহিরাকৃতি

গাছের বহিরাকৃতি অনেকটা ত্রিভুজাকার হবে। ক্ষেত্রবিশেষে গোলাকারও হতে পারে।

পাত্র

বনসাইয়ের টব বা পাত্র পরিষ্কার ও নিখুঁত হবে। টবের রঙ গাছের রঙ কিংবা ফুল, ফল ও পাতার রঙের সঙ্গে মানানসই হতে হবে। বনসাইয়ের পাত্র অপরিচ্ছন্ন থাকলে মশাসহ অন্যান্য পোকার আক্রমণ হতে পারে।

মনে রাখবেন-

বনসাইয়ের স্টাইল নানা ধরনের হয়। তবে মূলত পাঁচটি স্টাইল।

ফরমাল আপ রাইট

এই রীতির গাছগুলো চারদিকে সমানভাবে ডালপালা ছড়িয়ে উপরে ওঠে।

ইনফরমাল আপ রাইট

এ রীতির গাছও উপরে ওঠে তবে ডালপালা সাধারণের মতো অত বিন্যস্ত নয়, একটু এলোমেলো।

কাসকেড

কাসকেড রীতির গাছগুলো টবের সীমানা ছাড়িয়ে ঝরনার মতো নিচের দিকে গড়িয়ে নামে। সেমিকাসডেক বা অর্ধকাসকেড রীতির গাছ টবের প্রান্তসীমায় এসে আটকে যায়। একমাত্র কাসকেড ও সেমিকাসকেড বনসাইতে উঁচু পট/টব ব্যবহার করা হয়।

রুট ওভার রক

পাথরের ওপর যে বনসাই লাগানো হয় তাকে বলে রুট ওভার রক ।

এ ছাড়াও লিটার্চিক, টুইন ট্রাঙ্ক, মাল্টি ট্রাঙ্ক, রাফট ইত্যাদি নানা স্টাইলের বনসাই হয়ে থাকে।

এখন অনেকেই বনসাই করছেন। ঢাকার বেশ কয়েকটি অভিজাত দোকান থেকে আপনি বনসাই কিনতে পারবেন। কিছু কিছু নার্সারিতেও বনসাই কিংবা বনসাই করার উপযুক্ত গাছ পাওয়া যায়। দুই-তিনশ টাকা থেকে কয়েক হাজার টাকা দামের বনসাই দোকানে বা নার্সারিতে কিনতে পাবেন। গত বৃক্ষমেলায় লাখ টাকার উপরে একাধিক বনসাই উঠেছিল। তবে বনসাই শুধু কিনলেই হবে না, তাকে চিনতে এবং রক্ষণাবেক্ষনও করতে হবে। মনে রাখতে হবে, গাছের বৃদ্ধি কখনো থেমে থাকে না, কাজেই যে অবস্থায় আপনি বনসাইটি কিনলেন তা কোনো স্থায়ী অবস্থা নয়। প্রতি বছরই গাছে নতুন ডালপালা আসবে, শেকড় বাড়বে এবং আপনার বনসাইয়ের চেহারা পাল্টাবে।