অনলাইনে পাসপোর্ট আবেদন প্রক্রিয়া
বাংলাদেশে নতুন পাসপোর্ট তৈরি, পুরোনো পাসপোর্ট নবায়ন বা মেয়াদ শেষ হওয়া পাসপোর্ট পুনরায় ইস্যু করার জন্য ই-পাসপোর্টের আবেদন করা যায়। বর্তমানে ঘরে বসেই অনলাইনে আবেদন ফরম পূরণ, নির্ধারিত ফি প্রদান এবং আবেদনসংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ করা সম্ভব। তবে আবেদন সম্পন্ন করতে নির্ধারিত পাসপোর্ট অফিসে উপস্থিত হয়ে বায়োমেট্রিক তথ্য প্রদান করতে হয়।
Passport Application Online
এই পোস্টে বাংলাদেশে পাসপোর্ট আবেদন প্রক্রিয়া ২০২৬, অনলাইনে ই-পাসপোর্ট করার নিয়ম, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, পাসপোর্ট ফি, আবেদন জমা দেওয়া এবং পাসপোর্ট সংগ্রহের নিয়ম সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।
পাসপোর্ট আবেদন করার অফিসিয়াল ওয়েবসাইট
বাংলাদেশের ই-পাসপোর্টের আবেদন করতে সরকারি ওয়েবসাইট ব্যবহার করুন।
- অনলাইন আবেদন: https://www.epassport.gov.bd/
- আবেদনের নির্দেশনা: https://www.epassport.gov.bd/instructions/instructions
- পাসপোর্ট ফি: https://www.epassport.gov.bd/instructions/passport-fees
আবেদন করার আগে নিজের বর্তমান ঠিকানা অনুযায়ী কোন পাসপোর্ট অফিসে আবেদন জমা দিতে হবে, তা যাচাই করে নিন।
পাসপোর্ট করতে কী কী কাগজপত্র লাগে?
ই-পাসপোর্ট আবেদনের ক্ষেত্রে আবেদনকারীর বয়স, পরিচয়, পেশা এবং আবেদনের ধরন অনুযায়ী কাগজপত্রের প্রয়োজন হতে পারে।
সাধারণত নিচের কাগজপত্রগুলো প্রস্তুত রাখা ভালো:
- জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) অথবা প্রযোজ্য ক্ষেত্রে অনলাইন জন্মনিবন্ধন সনদের ইংরেজি সংস্করণ।
- অনলাইনে পূরণ করা আবেদনপত্রের প্রিন্ট কপি।
- পাসপোর্ট ফি জমার রসিদ।
- বর্তমান ঠিকানার প্রমাণ হিসেবে প্রযোজ্য নথি।
- পুরোনো পাসপোর্টের মূল কপি ও ফটোকপি—রি-ইস্যুর ক্ষেত্রে।
- পাসপোর্ট হারিয়ে গেলে সাধারণ ডায়েরি (জিডি) এবং প্রযোজ্য অন্যান্য কাগজপত্র।
- অপ্রাপ্তবয়স্ক আবেদনকারীর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য জন্মনিবন্ধন ও বাবা-মায়ের পরিচয়পত্রের তথ্য বা কপি।
- সরকারি চাকরিজীবীদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য NOC, GO বা সংশ্লিষ্ট সরকারি আদেশ।
- প্রযোজ্য ক্ষেত্রে বিবাহ সনদ, নিকাহনামা বা তালাকনামা।
- নির্দিষ্ট পেশার ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক কারিগরি সনদ।
মনে রাখবেন: সবার জন্য সব কাগজপত্র প্রয়োজন হয় না। আবেদন জমা দেওয়ার আগে সরকারি পোর্টালের সর্বশেষ নির্দেশনা ও ডকুমেন্ট চেকলিস্ট দেখে নিন।
অনলাইনে পাসপোর্ট আবেদন করার নিয়ম
ধাপ ১: ই-পাসপোর্ট ওয়েবসাইটে প্রবেশ করুন
প্রথমে https://www.epassport.gov.bd/ ওয়েবসাইটে প্রবেশ করুন। নতুন পাসপোর্টের আবেদন অথবা পাসপোর্ট পুনরায় ইস্যুর জন্য প্রযোজ্য অপশন নির্বাচন করুন।
ধাপ ২: বর্তমান ঠিকানা ও পাসপোর্ট অফিস নির্বাচন করুন
আপনি বাংলাদেশে নাকি বিদেশে থেকে আবেদন করছেন, তা নির্বাচন করুন। এরপর বর্তমান ঠিকানা অনুযায়ী জেলা, থানা এবং প্রযোজ্য পাসপোর্ট অফিসের তথ্য দিন।
ধাপ ৩: আবেদন ফরম পূরণ করুন
আবেদন ফরমে নাম, জন্মতারিখ, পিতা-মাতার নাম, বর্তমান ও স্থায়ী ঠিকানা, পেশা এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় তথ্য পূরণ করুন।
ফরম পূরণের সময় জাতীয় পরিচয়পত্র বা জন্মনিবন্ধনের তথ্যের সঙ্গে মিল রেখে তথ্য লিখুন। নামের বানান, জন্মতারিখ ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জমা দেওয়ার আগে ভালোভাবে যাচাই করুন।
ধাপ ৪: পাসপোর্টের ধরন নির্বাচন করুন
প্রযোজ্য বিকল্প থেকে পাসপোর্টের পৃষ্ঠা সংখ্যা, মেয়াদ এবং ডেলিভারির ধরন নির্বাচন করুন। কোন বিকল্প আপনার জন্য প্রযোজ্য, তা সরকারি পোর্টালে যাচাই করুন।
ধাপ ৫: আবেদন ফরম জমা দিন
সব তথ্য যাচাই করার পর আবেদন জমা দিন। এরপর আবেদন ফরমের প্রিন্ট কপি ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র প্রস্তুত রাখুন।
ধাপ ৬: পাসপোর্ট ফি পরিশোধ করুন
নির্ধারিত পদ্ধতিতে পাসপোর্ট ফি জমা দিন। সরকারি পোর্টালে অনুমোদিত অনলাইন পেমেন্ট অথবা নির্ধারিত ব্যাংকিং পদ্ধতি ব্যবহার করতে পারেন।
ফি জমার রসিদ সংরক্ষণ করুন।
ধাপ ৭: পাসপোর্ট অফিসে উপস্থিত হন
নির্ধারিত তারিখ ও নির্দেশনা অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট পাসপোর্ট অফিসে উপস্থিত হয়ে আবেদনপত্র, পরিচয়পত্র এবং প্রযোজ্য কাগজপত্র জমা দিন।
সেখানে সাধারণত ছবি তোলা, আঙুলের ছাপ, চোখের আইরিস এবং অন্যান্য বায়োমেট্রিক তথ্য সংগ্রহ করা হয়।
ধাপ ৮: আবেদন যাচাই ও পাসপোর্ট সংগ্রহ
আবেদন জমা দেওয়ার পর প্রযোজ্য যাচাই ও অনুমোদনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। আবেদন স্ট্যাটাস ও ডেলিভারিসংক্রান্ত নির্দেশনা অনুসরণ করুন। পাসপোর্ট প্রস্তুত হলে নির্ধারিত নিয়মে সংগ্রহ করুন।
বাংলাদেশে ই-পাসপোর্টের ফি ২০২৬
সরকারি ই-পাসপোর্ট পোর্টালে প্রকাশিত ফি তালিকা অনুযায়ী, বাংলাদেশে আবেদনের ক্ষেত্রে ১৫% ভ্যাটসহ নিচের ফিগুলো প্রযোজ্য।
| পাসপোর্টের ধরন | সাধারণ ডেলিভারি | জরুরি ডেলিভারি | অতি জরুরি ডেলিভারি |
|---|---|---|---|
| ৪৮ পৃষ্ঠা, ৫ বছর | ৪,০২৫ টাকা | ৬,৩২৫ টাকা | ৮,৬২৫ টাকা |
| ৪৮ পৃষ্ঠা, ১০ বছর | ৫,৭৫০ টাকা | ৮,০৫০ টাকা | ১০,৩৫০ টাকা |
| ৬৪ পৃষ্ঠা, ৫ বছর | ৬,৩২৫ টাকা | ৮,৬২৫ টাকা | ১২,০৭৫ টাকা |
| ৬৪ পৃষ্ঠা, ১০ বছর | ৮,০৫০ টাকা | ১০,৩৫০ টাকা | ১৩,৮০০ টাকা |
গুরুত্বপূর্ণ: আবেদনকারীর বয়স ও যোগ্যতার ভিত্তিতে পাসপোর্টের মেয়াদ এবং পৃষ্ঠা নির্বাচন সীমিত হতে পারে। ফি পরিবর্তিত হতে পারে, তাই টাকা জমা দেওয়ার আগে সরকারি ফি তালিকা যাচাই করুন।
পাসপোর্ট পেতে কত দিন সময় লাগে?
সরকারি পোর্টালে প্রকাশিত সময়সীমা অনুযায়ী, বায়োমেট্রিক এনরোলমেন্টের তারিখ থেকে সাধারণত নিচের সময় উল্লেখ করা হয়েছে:
| ডেলিভারির ধরন | আনুমানিক সময় |
|---|---|
| সাধারণ (Regular) | ১৫ কর্মদিবস |
| জরুরি (Express) | ৭ কর্মদিবস |
| অতি জরুরি (Super Express) | ২ কর্মদিবস |
এই সময়সীমা আবেদন ও প্রয়োজনীয় যাচাই সঠিকভাবে সম্পন্ন হওয়ার শর্তসাপেক্ষ। বাস্তবে যাচাই, অনুমোদন বা অন্যান্য কারণে বেশি সময় লাগতে পারে।
নতুন পাসপোর্ট ও রি-ইস্যুর মধ্যে পার্থক্য
নতুন পাসপোর্ট: যাঁরা প্রথমবার পাসপোর্ট করছেন, তাঁদের নতুন পাসপোর্টের আবেদন করতে হবে।
রি-ইস্যু: পাসপোর্টের মেয়াদ শেষ হলে, মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে নবায়ন প্রয়োজন হলে, অথবা নির্ধারিত কারণে পুরোনো পাসপোর্ট পুনরায় ইস্যু করতে হলে রি-ইস্যুর আবেদন করতে হয়। পুরোনো পাসপোর্টের মূল কপি ও প্রযোজ্য কাগজপত্র প্রস্তুত রাখুন।
পাসপোর্ট হারিয়ে গেলে বা চুরি হলে দ্রুত নিকটস্থ থানায় জিডি করুন এবং সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী পুনরায় আবেদনের ব্যবস্থা নিন।
পাসপোর্ট আবেদন করার সময় যেসব বিষয়ে সতর্ক থাকবেন
- NID বা জন্মনিবন্ধনের সঙ্গে মিল রেখে আবেদন ফরম পূরণ করুন।
- ভুল তথ্য দিয়ে আবেদন করবেন না।
- ফি কেবল সরকারি পোর্টালে অনুমোদিত মাধ্যমে পরিশোধ করুন।
- আবেদনপত্র, পেমেন্ট রসিদ এবং ডেলিভারি স্লিপ সংরক্ষণ করুন।
- কোনো ব্যক্তি বা অননুমোদিত প্রতিষ্ঠানকে টাকা দিয়ে তথ্য সংশোধন বা আবেদন দ্রুত করানোর চেষ্টা করবেন না।
- সরকারি পোর্টালের নির্দেশনা ও আবেদন স্ট্যাটাস নিয়মিত দেখুন।
পাসপোর্ট আবেদন সম্পর্কে সচরাচর প্রশ্ন
১. পাসপোর্ট করতে কি অনলাইনে আবেদন করা বাধ্যতামূলক?
ই-পাসপোর্টের সাধারণ আবেদন প্রক্রিয়ায় অনলাইনে আবেদনপত্র পূরণ করতে হয়। এরপর নির্ধারিত পাসপোর্ট অফিসে উপস্থিত হয়ে বায়োমেট্রিক তথ্য ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিতে হয়।
২. পাসপোর্ট করতে কি ছবি সত্যায়ন করতে হয়?
সরকারি ই-পাসপোর্ট নির্দেশনা অনুযায়ী সাধারণ আবেদনপত্রে ছবি সংযোজন বা সত্যায়নের প্রয়োজন হয় না। তবে ছোট শিশুদের ক্ষেত্রে বিশেষ নিয়ম প্রযোজ্য হতে পারে।
৩. ১৮ বছরের কম বয়সীরা কি পাসপোর্ট করতে পারবে?
হ্যাঁ। অপ্রাপ্তবয়স্কদের জন্য প্রযোজ্য জন্মনিবন্ধন, অভিভাবকের পরিচয়সংক্রান্ত তথ্য এবং অন্যান্য শর্ত পূরণ করে আবেদন করা যায়। বয়স অনুযায়ী পাসপোর্টের মেয়াদ ও পৃষ্ঠার নিয়ম আলাদা হতে পারে।
৪. পাসপোর্টের আবেদন স্ট্যাটাস কীভাবে দেখব?
সরকারি ই-পাসপোর্ট পোর্টালে প্রবেশ করে সেখানে দেওয়া আবেদন স্ট্যাটাস যাচাইয়ের নির্দেশনা অনুসরণ করুন।
৫. পাসপোর্টের ফি কোথায় দেখব?
সর্বশেষ ফি ও পেমেন্ট পদ্ধতি জানতে সরকারি ওয়েবসাইটের Passport Fees পেজ দেখুন।
উপসংহার
বাংলাদেশে ই-পাসপোর্টের আবেদন প্রক্রিয়া এখন অনেকটাই অনলাইনভিত্তিক। সঠিক তথ্য দিয়ে আবেদন ফরম পূরণ, নির্ধারিত ফি পরিশোধ, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র প্রস্তুত এবং বায়োমেট্রিক এনরোলমেন্ট সম্পন্ন করলে আবেদন প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া যায়।
পাসপোর্ট আবেদন করার আগে সর্বশেষ নিয়ম, ফি এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সরকারি ই-পাসপোর্ট ওয়েবসাইট থেকে যাচাই করুন। এতে ভুল আবেদন, অপ্রয়োজনীয় খরচ এবং সময় নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি কমবে।
অফিসিয়াল ওয়েবসাইট: https://www.epassport.gov.bd/