ইন্টেরিয়র ডিজাইন ক্যারিয়ার
কর্মমুখী শিক্ষায় স্বল্পমেয়াদি বিভিন্ন কোর্স করে আপনিও গড়তে পারেন স্বপ্নের ভবিষ্যৎ। অন্যের অধীনে চাকরি না করেও গড়ে তুলতে পারেন স্বতন্ত্র সেবাধর্মী ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। আর এসব কর্মমুখী শিক্ষার মধ্যে বর্তমানে চাকরির বাজারে এগিয়ে ইন্টেরিয়র ডিজাইন।
Interior design career
অনেকে শখের বিষয় ইন্টেরিয়র ডিজাইন কোর্স করলেও আজ পেশা হিসেবেই ইন্টেরিয়র ডিজাইন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বদলে যাচ্ছে সবকিছু। সব বিষয়ে চাই বিশেষজ্ঞ। ইন্টেরিয়র ডিজাইন একটি বহুমাত্রিক পেশা, যেখানে সৃজনশীল এবং প্রযুক্তি একসঙ্গে প্রয়োগ করা হয়। এর মূল লক্ষ গৃহ ও কর্মক্ষেত্রের সাজসজ্জাকে আরও আকর্ষণীয় করে তোলা। সুন্দর একটি ঘর কে না ভালোবাসে? ঘরকে রঙিন করতে কার না ভালো লাগে। রঙের ব্যবহার, আসবাব, কাপড় গৃহসজ্জার প্রধান উপকরণ। কোন পরিবেশে, কীভাবে, কোথায়, কী ধরনের রঙ ব্যবহার করব তা অনেকেই জানে না। কর্মক্ষেত্র ও গৃহে কি একই রঙ ব্যবহার হয়, না আলাদা রঙ ব্যবহার হয়? রঙের ব্যবহারের ওপর একটি ঘরের সৌন্দর্য ফুটে ওঠে। গাঢ় রঙ নজর কাড়ে আর হালকা রঙ স্নিগ্ধতার প্রতীক। দেয়ালের রঙের সঙ্গে মিল করে পর্দা ও আসবাব ব্যবহার করা হয়। রঙ ও আসবাবের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ফ্লোরে টাইলস করা হয়। পছন্দের আসবাব ও দেয়ালের রঙ ঘরকে আকর্ষণীয় করে তোলে। এসির সুবিধার্থে এবং ঘরকে আরও আকর্ষণীয় করে তোলার জন্য ফলস সিলিং ব্যবহার করে সিলিং হাইট কমিয়ে আনা যায়। কর্মক্ষেত্র আরও আকর্ষণীয় করার জন্য অফিসে বিশেষ ধরনের গাছ লাগানো যেতে পারে। এসব বিষয়ে নিজেকে দক্ষ করার জন্যই প্রয়োজন ইন্টেরিয়র ডিজাইন।
ইনটেরিয়র ডিজাইন কী : Interior শব্দটি এসেছে ল্যাটিন শব্দ Intro থেকে, যার অর্থ ভেতর, এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে Design শব্দটি, যার অর্থ নকশা। এই দুটি শব্দ একত্রিত করলে হয় Interior Design, যার আভিধানিক অর্থ দাঁড়ায় অভ্যন্তরীণ নকশা বা অন্দর সজ্জা। অনেকেই চান অফিস বা বাসা সুসজ্জিত হোক, যাতে অফিস বা বাসার মধ্যে কোনো স্পেস নষ্ট না হয়। এই ডেকোরেশনকে বলা হয় ইন্টেরিয়র ডিজাইন। সাধারণত ইন্টেরিয়র ডিজাইন বলতে ঘর গোছানোকে বুঝে থাকি আমরা, বাস্তবে শুধু ঘর গোছানো নয়, ইন্টেরিয়র ডিজাইন আরও ব্যাপক অর্থে ব্যবহৃত হয়।
ইন্টেরিয়র ডিজাইনার : প্রতিটি স্থানকে কাজে লাগিয়ে আসবাব, লাইট, গৃহসজ্জা সামগ্রীর যথাযথ ব্যবহারের মাধ্যমে বাড়ি, অফিস বা যেকোনো প্রতিষ্ঠানকে আরামদায়ক ও নান্দনিকভাবে উপস্থাপন করাই ইন্টেরিয়র ডিজাইনের প্রধান লক্ষ্য। আর যিনি এই কাজ দক্ষতার সঙ্গে করে থাকেন তিনি ইন্টেরিয়র ডিজাইনার। আগে আমাদের দেশে স্থপতিরাই সাধারণত কোনো ভবন নির্মাণের পাশাপাশি তার ইন্টেরিয়র ডিজাইন করতেন। কিন্তু বর্তমানে আর্কিটেকচার ও ইন্টেরিয়র ডিজাইন পৃথকভাবে করা হচ্ছে।
পেশায় আসতে হলে : সমসাময়িক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশে ইন্টেরিয়র ডিজাইন কোর্সটির খুবই চাহিদা। এইচএসসি পাস করে যে কেউ এ কোর্সটি করতে পারেন। ইন্টেরিয়র ডিজাইনার হওয়ার প্রথম ও প্রধান শর্ত হলো সৃষ্টিশীল চিন্তাভাবনা করার মানসিকতা থাকতে হবে। সেই সঙ্গে থাকতে হবে সূক্ষ্ম পরিকল্পনা করার মানসিকতা। একজন সত্যিকারের পেশাদার ডিজাইনারকে পারিপার্শ্বিক পরিবেশ, সবার বাসযোগ্য স্থান, অফিস-আদালতের সুপরিসর কর্মসংস্থান, খেলার ময়দান ইত্যাদি স্থানকে নিজের চিন্তা-কল্পনা, গবেষণা, সৃজনশীলতা ও আপন মনের মাধুরী মিশিয়ে আরও আকর্ষণীয়ভাবে ফুটিয়ে তুলতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হতে হবে। কাজের ফাঁকে বা যে কোনো অবসরে নিত্যনতুন রুচিশীল, আকর্ষণীয় ডিজাইন উদ্ভাবনে একজন ইন্টেরিয়র ডিজাইনার সদা নিমগ্ন থাকেন। ইন্টেরিয়র ডিজাইনার হিসেবে কাজ করতে গেলে শুধু কাক্সিক্ষত ডিজাইন এঁকে দেওয়াটাই যথেষ্ট নয়, বরং একজন ডিজাইনারকে তার নিজস্ব ডিজাইন ও প্লানিং ছাড়াও এ কাজে জড়িত কাঠমিস্ত্রি, রঙমিস্ত্রি, ইলেকট্রিশিয়ান- সবার কাজ ভালোভাবে দেখাশোনা করতে হয় শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত। একজন উঁচুমানের ইন্টেরিয়র ডিজাইনার তার নিজস্ব স্বপ্ন, কল্পনা, অনুভূতি দিয়ে একটি মলিন, নিষ্প্রাণ স্থানকেও করে তুলতে পারেন সজীব, প্রাণবন্ত, প্রশান্তিময় এবং অপূর্ব সুন্দর।
কোথায় শিখবেন : বাংলাদেশে বর্তমানে ইন্টেরিয়র ডিজাইন শেখানোর বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এক বছর থেকে দুই বছর ও ছয় মাস মেয়াদি এসব কোর্সে খরচ পড়বে ৪০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা পর্যন্ত। তবে এককালীন বা কিস্তিতেও টাকা শোধ করা যায়। সে ক্ষেত্রে টাকা কম বা বেশি হতে হবে। এসব কোর্সে সাধারণত যেসব বিষয় পড়ানো হয়- ফ্লোরিং, ফার্নিশিং, ফলস সিলিং, বিদ্যুৎ, আলো, এয়ারকন্ডিশনার, প্লাম্বিং, কিচেন ইত্যাদি।
পেশা হিসেবে ইন্টেরিয়র ডিজাইন : আধুনিক স্থাপনার অভ্যন্তরীণ সৌন্দর্যবর্ধনে প্রধান ভূমিকা রাখছেন ইন্টেরিয়র ডিজাইনাররা। একটি প্রতিষ্ঠানের অন্দরমহলের সাজসজ্জা বৃদ্ধিতে ইন্টেরিয়র ডিজাইনারদের চাহিদা বুঝতে পারছে কর্তৃপক্ষ। আর তাই বেড়েছে ইন্টেরিয়র ডিজাইনারদের চাহিদা। তাই এ ক্ষেত্রে উন্নত ক্যারিয়ার গড়তে পারেন যে কেউই। আবার বিবিএ, এমবিএ, অনার্স কিংবা গ্র্যাজুয়েশন করার পাশাপাশি ইন্টেরিয়র ডিজাইনের ওপর শর্ট বা লং কোর্স করেও গড়তে পারেন স্বতন্ত্র কর্মসংস্থান। মূলত ইন্টেরিয়র ডিজাইনারের চাহিদা এখন বিশ্বব্যাপী। একটি নতুন ভবন যখন তৈরি হয়, সেই ভবনে অফিস কিংবা বাসা যাই হোক না কেন, ব্যবহারকারীরা চাইবেন সেটিকে নিজের চাহিদামতো সাজাতে। একজন ইন্টেরিয়র ডিজাইনার ছাড়া তা কখনই সম্ভব নয়। প্রায় সব রিয়েল এস্টেট প্রতিষ্ঠানই এখন ইন্টেরিয়র ডিজাইনার নিয়োগ দিচ্ছে। তাই এখনই এ দেশে ইন্টেরিয়র ডিজাইনারদের চাহিদা তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশে ইন্টেরিয়র ডিজাইনারদের কাজের ক্ষেত্র ক্রমেই বাড়ছে। তাই সার্থকভাবে ইন্টেরিয়র ডিজাইন কোর্সটি শেষ করার পর সহজেই চাকরি পাওয়া যায়।
সাধারণত যেসব ক্ষেত্রে চাকরির সুযোগ রয়েছে সেগুলো হলো- দালান নির্মাণ, আবাস, প্রতিষ্ঠান, বিভিন্ন করপোরেট গ্রুপ, স্থাপত্য পরামর্শক প্রতিষ্ঠান, ইন্টেরিয়র ডিজাইন প্রতিষ্ঠান, আসবাব নির্মাতা ও বাজারজাতকরণ প্রতিষ্ঠান, বিভিন্ন নামীদামি হোটেল, বিজ্ঞাপন সংস্থাসহ বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের স্থাপত্য বিভাগ। অনেক প্রতিষ্ঠান আছে, শতভাগ চাকরির সুবিধা দিয়ে প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকে। এই পেশার মূল সুবিধা হলো, অন্য পেশার পাশাপাশি প্রশিক্ষণ নিয়ে একে পূর্ণ পেশা হিসেবে নেওয়া যায়। চাকরির ক্ষেত্রে প্রশিক্ষিত ডিজাইনারদের চাহিদা বাড়ার কারণে বর্তমানে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে এই পেশায় যাওয়ার আগ্রহ বেড়েছে।
ফ্রিল্যান্সার হিসেবে ইন্টেরিয়র ডিজাইন : বর্তমানে দেশে অনেক ইন্টেরিয়র ডিজাইন ফার্ম প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, যারা অত্যন্ত সফলতার সঙ্গে ইন্টেরিয়র ডিজাইন করে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। ফলে এসব প্রতিষ্ঠানে অনেক চাকরির সুযোগও বাড়ছে। এর পাশাপাশি ইন্টেরিয়র ডিজাইন শেখার পর ফ্রিল্যান্সার হিসেবে কাজ করারও সুযোগ রয়েছে। তবে ফ্রিল্যান্সার হিসেবে কাজ করার জন্য সৃজনশীলতার পাশাপাশি চাই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করার মানসিকতাও। আমাদের দেশের অনেক তরুণ-তরুণী আপওয়ার্ক (ওডেস্ক) কিংবা ফ্রিল্যান্সার ডটকমে অটো ক্যাড অথবা থ্রিডি স্টুডিও ম্যাক্সের সাহায্যে বিভিন্ন ইন্টেরিওর আইডিয়া ডিজাইন করে আয় করছেন হাজার ডলার। বর্তমানে দেশে অনেক ইন্টেরিয়র ডিজাইন কোম্পানি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, যারা অত্যন্ত সফলতার সঙ্গে ইন্টেরিয়র ডিজাইন করে যাচ্ছে।
আয়রোজগার : ইন্টেরিয়র ডিজাইনার হিসেবে চাকরি শুরু করলে শুরুতে ২০ থেকে ৬০ হাজার টাকা মাসিক আয় হতে পারে। কাজের অভিজ্ঞতা অনুযায়ী আয় বাড়তে থাকবে। সৃজনশীলতা ও দক্ষতা থাকলে এই পেশায় অনেক ভালো আয় করা সম্ভব।
ক্যারিয়ার গ্রাফ : সাধারণত অ্যাসিস্ট্যান্ট ডিজাইনার হিসেবে কোনো আর্কিটেকচার ফার্মে বা রিয়েল এস্টেট কোম্পানিতে চাকরি শুরু হবে। অভিজ্ঞতা বাড়ার সঙ্গে ম্যানেজারিয়াল পদে উন্নীত হবে। সর্বোচ্চ পর্যায়ে একটি প্রতিষ্ঠানের ইন্টেরিয়র ডিজাইনের প্রধান হিসেবে যোগদান করা সম্ভব। তবে বহু ইন্টেরিয়র ডিজাইনার নিজেদের ফার্ম খুলে স্বাধীনভাবে কনসালটেন্সি করাকে প্রাধান্য দিয়ে থাকেন।