ট্রাভেল এজেন্ট ক্যারিয়ার

ট্রাভেল এজেন্ট ক্যারিয়ার

একজন ট্রাভেল এজেন্টের কাজ হলো ভ্রমণ বিষয়ে পরামর্শ দেওয়া, ট্রাভেল প্যাকেজ তৈরি করা, কোথায় কোন সময় বেড়ানো যায় ও কেমন খরচ এসব বিষয়ে খোঁজখবর রাখা, রিজার্ভেশন এবং ভিসার ব্যবস্থা করা।

Travel agent career

ভ্রমণ করা মানুষের নেশা। তা ছাড়া দিন দিন ভ্রমণপিপাসু মানুষের সংখ্যাও বাড়ছে। নাগরিক জীবন থেকে একটু স্বস্তির আশায় মানুষ বিভিন্ন জায়গায় ভ্রমণ করে থাকে। সেটা হতে পারে পুরো পরিবার, বন্ধুবান্ধব অথবা সহকর্মী নিয়ে অথবা একাই। এ জন্য প্রয়োজন বাড়ছে ট্রাভেল এজেন্টদের। একজন ট্রাভেল এজেন্ট সুন্দরভাবে গাইড করে ভ্রমণকে করে তুলবেন আনন্দময়। তাই আপনার যদি আগ্রহ থাকে, তাহলে আপনি এটাকে পেশা হিসেবে নিতে পারেন এবং আপনার বুদ্ধিমত্তা ও শ্রম দিয়ে পেশাটিকে আরও চমকপ্রদ অবস্থায় নিতে পারবেন।

কাজের সুযোগ : একজন ট্রাভেল এজেন্টের কাজ ট্যুরিজম ইন্ডাস্ট্রিতে। তারা মূলত ট্রাভেল এজেন্সিগুলোতে কাজ করেন। এ ছাড়া হজ এজেন্সিগুলোতেও ট্রাভেল এজেন্টরা কাজ করেন। ট্রাভেল এজেন্টদের পদবি কোথাও কোথাও রিজার্ভেশন অফিসার, হলিডে এক্সিকিউটিভ অথবা ট্রাভেল এজেন্সি ম্যানেজার। দিন দিন ভ্রমণপিপাসু মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। বাংলাদেশে বিদেশি পর্যটকের সংখ্যা না বাড়লেও দেশের অভ্যন্তরীণ পর্যটন খাতে এক নীরব বিপ্লব এসেছে। বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বিমান যোগাযোগ ব্যবস্থা স্থাপন হওয়ায় এখন প্রচুর মানুষ বিদেশে ঘুরতে যাচ্ছে। সেই সঙ্গে ব্যবসায়িক কাজে বিদেশে যাওয়াও প্রচুর বেড়েছে। এ চাহিদার কথা মাথায় রেখে দেশে এখন ২ হাজারের বেশি ট্রাভেল এজেন্সি আছে। আর প্রায় ১৩০০ লাইসেন্সপ্রাপ্ত হজ এজেন্সি রয়েছে। এত বিপুলসংখ্যক এজেন্সির জন্য প্রচুর ট্রাভেল এজেন্ট প্রয়োজন।

ট্রাভেল এজেন্টের কাজ : যে কোনো প্রকার টিকিট ও হোটেল বুকিং/ক্যানসেল/রিফান্ড করা; টিকিট ইস্যু সংক্রান্ত যে কোনো ডকুমেন্ট সংরক্ষণ করা; গ্রাহকদের কাছ থেকে সময়মতো অর্থ বুঝে নেওয়া; গ্রাহকসেবা নিশ্চিত করা ও গ্রাহকদের সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখা; গ্রাহকদের যেকোনো অভিযোগের সুরাহা করা; গ্রাহকদের সময় ও বাজেট অনুযায়ী ট্যুরিস্ট ডেস্টিনেশন ও ট্যুর প্যাকেজ সম্পর্কে ধারণা দেওয়া; গ্রাহকদের ভিসা সম্পর্কিত ব্যাপারে সাহায্য করা; এয়ারলাইনস কোম্পানি, হোটেলগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক রাখা এবং তাদের বিভিন্ন অফার সম্পর্কে আপটুডেট থাকা;দৈনিক, সাপ্তাহিক ও মাসিক সেলস রিপোর্ট তৈরি করা।

যোগ্যতা : ট্রাভেল এজেন্ট হতে হলে উচ্চশিক্ষিত হতে হবে এবং ইংরেজিতে পারদর্শী হতে হবে। উচ্চশিক্ষা এই পেশায় অন্যদের চেয়ে কিছুটা হলেও এগিয়ে রাখবে। অধিকাংশ জব সার্কুলার যেকোনো বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রিধারীদের জন্য উন্মুক্ত হলেও অনেক ক্ষেত্রে বিবিএ ডিগ্রিধারীদের প্রাধান্য দেওয়া হয়। ট্রাভেল অ্যান্ড ট্যুর ম্যানেজমেন্ট সম্পর্কিত যেকোনো সার্টিফিকেট বা দ্য ইন্টারন্যাশনাল এয়ার ট্রান্সপোর্ট অ্যাসোসিয়েশন (IATA) স্বীকৃত যে কোনো ইনস্টিটিউট থেকে ফেয়ারস অ্যান্ড টিকেটিংয়ের ওপর ডিপ্লোমা ডিগ্রি থাকলে যে কোনো স্থানে অগ্রাধিকার পাওয়া যায়

প্রশিক্ষণ : ট্রাভেল এজেন্ট হিসেবে ক্যারিয়ার গড়তে চাইলে ট্রাভেলিংয়ের ওপর প্লানিং কোর্স করতে হবে। আমাদের দেশে বর্তমানে বিভিন্ন ট্রাভেল প্লানিং কোর্স চালু আছে। এখানে রিজার্ভেশন সিস্টেম, ট্রাভেলের নিয়মকানুন (দেশীয় ও আন্তর্জাতিক), মার্কেটিং ইত্যাদি শেখানো হয়, যা চাকরি পাওয়ার সম্ভাবনা বাড়িয়ে দেবে। আপনি চাইলে অনলাইন থেকেও অনেক ট্রেনিং কোর্স করা যায়, যা এগিয়ে যেতে সহযোগিতা করবে। এসব ক্ষেত্রে কিছু প্রোগ্রামে ইন্টার্নশিপের ব্যবস্থাও আছে। অ্যাসোসিয়েশন অব ট্রাভেল এজেন্টস বাংলাদেশ (ATAB) ট্যুরিজম ট্রেনিং ইনস্টিটিউটে এয়ার টিকেটিং অ্যান্ড ট্রাভেল এজেন্সি অপারেশনসের ওপর ডিপ্লোমা ডিগ্রি দেওয়া হয়। বাংলাদেশ এয়ারলাইনস ট্রেনিং সেন্টার, বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনে ট্রাভেল এজেন্টদের জন্য ট্রাভেল এজেন্সি অপারেশনের ওপর কোর্স করানো হয়। গ্লোবাল ডিস্ট্রিবিউশন সিস্টেম (GDS) AMADEUS এবং SABRE-এর ট্রেনিং সেন্টারসহ অসংখ্য বেসরকারি ট্রেনিং সেন্টারে GDS সিস্টেম, টিফকট ফেয়ার অ্যান্ড রিজার্ভেশন সিস্টেমের ওপর কোর্সের সুযোগ আছে।

দক্ষতা ও জ্ঞান : ট্রাভেল এজেন্ট হিসেবে ভালো করতে হলে অবশ্যই নিজের যোগাযোগ দক্ষতা বাড়াতে হবে। গ্রাহককে কমিশন দিতে হবে। তাই অনেকের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক রাখতে হবে। বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়াতে হবে, এমন মানুষদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে হবে, যাদের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন হবে এবং যারা কাজে সহযোগিতা করবেন।

দক্ষ ট্রাভেল এজেন্টকে ভাষাজ্ঞান বাড়াতে হবে। অন্তত ২টি ভাষা জানা থাকলে অনেক কাজে দেবে। শুধু চাকরির করার জন্য নয়, নিজের ট্রাভেল এজেন্সি খুলতে চাইলে এই ভাষাজ্ঞান অনেক সাহায্য করবে। ইংরেজির ওপর বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ ইংরেজি হলো আন্তর্জাতিক ভাষা। তাই ইংরেজিতে ভালো দখল থাকলে এটি অনেক দূর এগিয়ে নেবে।

একজন ট্রাভেল এজেন্টকে অবশ্যই আত্মবিশ্বাসী এবং পরিশ্রমী হতে হবে। ক্লায়েন্টকে বিশ্বাস করাতে হবে যে, আপনিই সবচেয়ে ভালো ট্যুর প্ল্যান দিচ্ছেন। আপনিই সবচেয়ে কম খরচে বেশি সুবিধা দিচ্ছেন। আপনার যোগাযোগ করার ক্ষমতাও অনেক ভালো হতে হবে। কারণ ডেস্কে বসেই বেশির ভাগ কাজ যেমনÑ ইমেইল করা, ফোনে যোগাযোগ করা, খোঁজ নেওয়া এসব করতে হবে আপনাকে।

আপনার কাছে সব গ্রাহকই সমান গুরুত্বপূর্ণ। তা ছাড়া প্রত্যেক গ্রাহকের চাহিদা থাকবে আলাদা আলাদা। এটা আপনাকে মেনে নিতে হবে। কারণ এটাই স্বাভাবিক। সবাই যার যার কাজ, ছুটি অনুযায়ী তার ভ্রমণ সাজাতে চাইবে এবং সেই সময়ের সবচেয়ে ভালো অফারটি চাইবে। আপনাকে সে অনুযায়ী প্রস্তুতি রাখতে হবে।

এর সঙ্গে সঙ্গে নির্ভুল হিসাবের সক্ষমতা, একনাগাড়ে পরিশ্রম করার মানসিকতা, যে কোনো সময়ে গ্রাহকসেবা নিশ্চিত করা, বিভিন্ন এয়ারলাইনস-হোটেল-ট্যুরিস্ট ডেস্টিনেশন নিয়ে ধারণা রাখা, টিকিট-হোটেল রিজার্ভেশনের নীতিমালা সম্পর্কে জানা। অবশ্যই গ্লোবাল ডিস্ট্রিবিউশন সিস্টেম (GDS), বিশেষ করে GALELIO, SABRE ও AMADUES অপারেট করতে জানতে হবে। স্পষ্ট ভৌগোলিক জ্ঞান থাকতে হবে। ভালো কনভিন্সিং ও নেগোসিয়েশন স্কিল থাকতে হবে। বিভিন্ন দেশের ভিসা, ভ্রমণসংক্রান্ত নীতিমালা সম্পর্কে জানতে হবে। প্রচুর পরিশ্রমী ও সময়ানুবর্তী হতে হবে। গ্রাহকদের সময়মতো সেবা দিতে হবে।

এর সঙ্গে সঙ্গে নিজে ভ্রমণ করুন। তাহলে এ বিষয়ে আপনার জ্ঞান বাড়বে। কারণ সব জ্ঞান তো আর ফোনে বা ইন্টারনেটে পাওয়া যাবে না। তাই আপনিও ভ্রমণ করুন। তা ছাড়া নিজে ভ্রমণ করলে আপনি সহজেই এই পেশাকে বুঝতে পারবেন। নিজে ভ্রমণ করলে আপনি বিভিন্ন এলাকা সম্পর্কে জানতে পারবেন, যা খুব সহজেই আপনি আপনার ক্লায়েন্টদের সামনে উপস্থাপন করতে পারবেন। অনেক ক্ষেত্রে হয়তো আপনাকে কোনো তৃতীয় পক্ষের সাহায্য নিতে হবে না।

আয়রোজগার : যে কোনো ট্রাভেল এজেন্সিতে স্থায়ীভাবে নিয়োগ পেতে হলে প্রয়োজন অভিজ্ঞতা। এ জন্য ট্রাভেল এজেন্সিতে ইন্টার্নশিপ করতে হয়। ইন্টার্নশিপে মাসিক ৫-৭ হাজার টাকা পাওয়া সম্ভব। ইন্টার্নশিপ শেষে কোনো ট্রাভেল এজেন্সিতে ১০-১২ হাজার টাকা বেতনে চাকরি পাওয়া যায়। তবে ট্রাভেল প্যাকেজ এবং টিকিট সেলিংয়ের ওপর প্রচুর কমিশন পাওয়া যায়। অনেক ক্ষেত্রে এই কমিশন মূল বেতনের দেড় থেকে দ্বিগুণ হয়। কয়েক বছরের অভিজ্ঞতা থাকলে বেতন ২০-৪০ হাজার টাকা হয়। সাধারণত ট্রাভেল এজেন্ট হিসেবে মাসিক আয় নির্ভর করে পরিশ্রম ও কাস্টমার হ্যান্ডলিংয়ের ওপর।

Similar Posts

Leave a Reply